আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনা

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনা

শুভ হোক ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের বছর
গণতন্ত্র ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় গড়ে উঠুক নতুন বাংলাদেশ

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চেতনা


মো: আব্দুল বারি খান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বিটিবি নিউজ: মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২৬মার্চ। স্বাধীনতার ৪৯তম বার্ষিকী। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল সূচনার দিন। স্বাধীনতার বাঁধনহারা আনন্দে, উৎসবে উদ্বেলিত হওয়ার দিন। যাদের ত্যাগ আর রক্তে অর্জিত এই স্বাধীন ভূখন্ড সেই বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। মুক্তির আনন্দে সমৃদ্ধির শপথে মুষ্টিবদ্ধ হওয়ার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হয়ে মুক্তির লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল এ দেশের মানুষ। ঘোষণা হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা। নানা আয়োজনে এবার পালিত হচ্ছে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। পুরো জাতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করবে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের। উৎসবের আনন্দে পালিত হবে স্বাধীনতার বার্ষিকী। শ্রদ্ধার সঙ্গে জাতি স্মরণ করবে স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ দিনটি সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে পালিত হবে নানা কর্মসূচি।এই মহান দিনে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। স্বাধীনতাসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ সব নেতার স্মৃতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আন্তরিক সংহতি ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পরিবার-পরিজন এবং বর্বর নৃশংসতার শিকার নারীদের প্রতি।
বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিন। এ ভূ-ভাগের সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালির সহস্র বছরের জীবন কাঁপানো ইতিহাস- মহান স্বাধীনতা। অত্যাচার-নিপীড়নে জর্জরিত বাঙালি জাতির সামনে আলোকময় ভবিষ্যতের দুয়ার খুলেছিল এই দিন। গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনে বীর বাঙালি সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। তাই এদিন গৌরব ও অহঙ্কারের দিন। প্রিয় স্বাধীন মাতৃভূমিকে হিংস্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রগতি, কল্যাণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার, কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংহত করার নতুন শপথে বলিয়ান হওয়ার দিন। ঝড়ের ভিতরে বিকশিত অটল বৃক্ষের জীবন্ত প্রতীক স্বাধীনতা নামের অগ্নস্ফুলিঙ্গ আজো প্রচন্ড ঝাঁকি দেয় রক্তে, শাণিত করে চেতনা।
কোনো হুইসেল বা সৈনিকের ঘোষণায় নয়, এই মহার্ঘ স্বাধীনতা অর্জন করতে বাঙালি জাতিকে করতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, দিতে হয়েছে এক সাগর রক্ত। এদিনটি বাঙালির শৃঙ্খল মুক্তির দিন। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল। বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালি। ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে একাত্তরের এই দিন যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ, দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন তার চূড়ান্ত পরিণতি। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহঙ্কারের দিন ২৬মার্চ।
সেই জনযুদ্ধের পর ৪৮ বছর পেরিয়ে গেছে, আর এক বছর পরই আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব। স্বাধীনতা দিবসে আমাদের ফিরে দেখা ও আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ আসে। যে স্বপ্ন ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, তার কতটা পূরণ হয়েছে। এতে কোনো ভুল নেই, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্ব নন্দিত নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সমুদ্র তলদেশ থেকে মহাকাশে ভাসছে বাংলাদেশের সাফল্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের তুলনায় দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার পরও মৌলিক খাদ্যচাহিদা পূরণ হয়েছে, শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, মানবসম্পদ উন্নয়নের অনেক সূচকে আমাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। আর এই স্বাধীনতার মাসেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। 
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র ও সামগ্রিক ন্যায়। আমাদের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সব ধরনের অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্য থেকে মানুষের মুক্তি ঘটবে। বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও সুখী একটি রাষ্ট্র, যা পরিচালিত হবে আইনের শাসনের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, মতপ্রকাশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা, বিরুদ্ধ মতের প্রতি সহনশীলতা, সব রাজনৈতিক কর্মকান্ড হবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। গণতন্ত্র ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা পাক গড়ে উঠুক সম্ভাবনাময় নতুন বাংলাদেশ। 
সারাদেশে গণহত্যা, ভয়াল ‘কালরাত্রি’র পোড়া কাঠ, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। ভীতবিহ্বল মানুষ দেখল লাশপোড়া ভোর। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। পুড়ছে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল সবুজ পতাকা। জ্বলছে শাড়ি, খুকুর ফ্রক। চোখে জল। বুকে আগুন। জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ তীব্র স্লোগান তুলে ট্যাঙ্কের সামনে এগিয়ে দিল সাহসী বুক। আজ থেকে ৪৮ বছর আগের ঠিক এমনি এক ভোররাতে পাক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি। ঘোরতর ওই অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য। 
আমাদের হিসাবের খাতায় জমা হয়েছে অনেক অনেক সাফল্য, স্মরণীয় দিন। আবার হাহাকার আর শোকে কষ্টে ভরা। অতীতের সকল অসুন্দর এবং ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় মানুষ স্বাধীনতার ৪৮তমবার স্বাগত জানালো ২০১৯ সালে এ দিবসটিকে এবং মুজিববর্ষকে স্বাগত জানালো সরকারসহ দেশের প্রাণ প্রিয় মানুষগুলো। স্মৃতির ক্যানভাসে সেই দিনগুলো কড়া নাড়বে মনের দরোজায়। নতুন দিনের নতুন সূর্যালোকে স্নান করে সিক্ত হয় জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সব শ্রেণীপেশার মানুষ। সম্ভাবনাময় আগামীর জন্য নতুন কেতন ওড়াতে ওড়াতে এগিয়ে যাবে সময়।
এগিয়ে যাবে সভ্যতা, হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানিমুক্ত রাজনীতি, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি। অনাবিল স্বপ্ন আর অফুরন্ত প্রাণোন্মাদনা নিয়েস্বাধীনতার ৪৯তম দিবসের নতুন সূর্যের আলোয় অগ্রসর হবে মানুষ। নতুন হয়ে জেগে উঠে মানুষ একরাশ প্রত্যাশার স্বপ্ন নিয়ে। তেমনই প্রত্যাশায় মিথ্যার কুহেলিকা ভেদ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সঠিক ধারায় অপশক্তির বিরুদ্ধে মুজিববর্ষে সূচিত হোক যুথবদ্ধ যাত্রা।
সুন্দর আগামীর জন্য সম্ভাবনার সমারোহে ঢাকা আমার গ্রাম আমার শহর উন্নয়নেশান্তিকামী মানুষের প্রার্থনা- আর কোন সহিংসতা নয়, কোন হত্যা, খুন কিংবা হানাহানির রাজনীতি নয়। এগিয়ে যাবে সভ্যতা, হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানিমুক্ত রাজনীতি, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি। অনাবিল স্বপ্ন আর অফুরন্ত প্রাণোন্মাদনা নিয়ে মুজিববর্ষে উন্নয়নের আলোয় অগ্রসর হওয়ার প্রত্যাশায় শান্তিকামী মানুষগুলো। এবারের স্বাধীনতা দিবসসহ “মুজিববর্ষ” হোক শান্তির বীজ বপনের বছর। এবছরটি একেবারেই আলাদা। মুজিববর্ষে নতুন হয়ে জেগে উঠবে মানুষ একরাশ প্রত্যাশার স্বপ্ন নিয়ে। 
আসুন, মনোবল শক্ত রাখি। করোনা ভাইরাস একটা যুদ্ধ। ভয়ানক একটা ছোঁয়াচে ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের অঘোষিত যুদ্ধ। আমাদের যুদ্ধ কৌশল হলো আমরা এ ভাইরাসকে আমাদের শরীর স্পর্শ করতে দিবনা। তার জন্য যত ধরণের নিয়ম আছে তা পালন করে যাব। সাময়িক কষ্ট হলেও তা করব। করোনা পরিস্হিতি মোকাবিলায় সরকার, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিগণ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পরিচ্ছন্নতার নিয়মকানুন মেনে চলুন। অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাঘুরি করবেন না। মনে সাহস রাখুন। অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলো আসবেই।
হিসাবের খাতায় ব্যর্থতার গ্লানি মুছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে মুজিববর্ষে শান্তিকামী মানুষের প্রার্থনা; আর কোন সহিংসতা নয়, কোন হত্যা, খুন কিংবা হানাহানির রাজনীতি নয়। মুজিববর্ষ হোক শান্তি ও সীমাহীন উন্নয়নের বীজ বপনের বছর। থেমে যাক মিথ্যাচার, সব যুদ্ধ-সন্ত্রাস, বন্ধ হউক জঙ্গিবাদ, গড়ে উঠুক দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, নিয়ন্ত্রন হউক মাদক। মুজিববর্ষ উদ্যাপনের বর্ষটি শুধু নতুন একটি বছরই নয়, শুরু হলো একটি চ্যালেঞ্জিং বছরও। মুজিববর্ষে পূরণ হবে তো শান্তিকামী মানুষের সে প্রার্থনা!
২০২০-২১ সালকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বছরব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর শুরুর দিনটি সারা দেশে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায় ব্যাপকভাবে গৃহিত কর্মসূচি পালিত হলেও করোনা ভাইরাসের কারণে অনেক কিছু থমকে গেছে। সবকিছু পেছনে ফেলে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি নিয়ে এখন উন্নতির পথে কাজ চলছে। উন্নয়নের মহাসড়কে চলমান বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট মহাকাশে পৌঁছে গেছে। নতুন এ বছরে অনেক অসমাপ্ত কাজ করাসহ অনেক বিষয়ের সমাধান করতে হবে রাষ্ট্রবিধায়কদের। সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবেলা করে মুক্তিযুদ্ধের সকল পক্ষ শক্তিকে শক্ত ঐক্যের বাঁধনে নিয়ে আসা, সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রতিরোধ, সংঘাত-সহিংস রাজনীতির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার রাজনীতি, সুন্দর আগামীর জন্য সমাজ তথা ডিজিটাল দেশ উন্নয়নের বাহরী ছোঁয়াসহ অর্থনীতির গতিসঞ্চার করে মুজিববর্ষ উদ্যাপনসহ একটি শান্তিময় সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েই এলো ‘মুজিববর্ষ’। তবুও শুভ হোক মুজিববর্ষ উদযাপনের বছরটি।