জাকাত আদায় না করার রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি

জাকাত আদায় না করার রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি

ডেস্ক: ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তি রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যাকাত। কোনো ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর চাঁদের হিসাবে পরিপূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে তার ওপর পূর্ববর্তী বছরের জাকাত প্রদান করা ফরজ।

প্রত্যেক মুসলমানকে যেমন জাকাত ফরজ হওয়ার বিষয় সম্পর্কে বিশ্বাস করতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে যার ওপর জাকাত ফরজ তাকে তা নিয়মিত পরিশোধও করতে হবে। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর জাকাত প্রদান করা ফরজ।

এক সাহাবি এসে নবী করিম (সা.) এর কাছে আরজ করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাকে এমন কিছু আমলের কথা বলেন, যা করে আমি জান্নাতে যেতে পারবো। রাসূল (সা.) তাকে বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। ফরজ নামাজ কায়েম করবে। ফরজ জাকাত আদায় করবে। রমজানে রোজা রাখবে।

জাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়া এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরই গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে জাকাত। জাকাতের বিধান পরিপূর্ণরূপে নাজিল হয়েছে মদিনায় আসার পর। দ্বিতীয় হিজরিতে রোজার বিধান নাজিলের পর, জাকাতের বিধান নাজিল হয়।

সহিহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেন, ইসলামের ভিত্তি পাচঁটি বিষয়ের ওপর- এক. আল্লাহ তায়ালা এক এবং মুহাম্মাদ (সা.) তার প্রেরীত রাসূল (সা.) এ কথার সাক্ষ্য দেয়া দুই. নামাজ কায়েম করা তিন. জাকাত দেয়া চার. রমজান মাসে রোজা রাখা পাঁচ. সামর্থ্য হলে হজ করা।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস নম্বর-৮)।

আল কোরআনে যেখানেই নামাজের আলোচনা এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে এসেছে জাকাতের আলোচনাও। নও মুসলিমরা রাসূল (সা.)-কে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলতেন ইসলামের স্তম্ভ পাঁচটি বিষয়ের ওপর। কোনো কোনো বর্ণনায় তিন, চার বা এর চেয়ে কমবেশির উল্লেখ আছে। তবে জাকাতের কথা সবকটিতেই এসেছে। এর দ্বারাও জাকাতের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সা.) এর কাছে এসে বাইয়াত হতেন। বাইয়াতে যেসব বিষয় রক্ষা করে চলার ওয়াদা করতেন, এর অন্যতম হতো জাকাত দেয়া। হজরত জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) এর হাতে বাইয়াত হয়েছি, নামাজ কায়েম করা, জাকাত দেয়া ও প্রত্যেক মুসলমানের কল্যাণ কামনা করার ওপর।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস নম্বর-১৪০১)।

এক সাহাবি এসে নবী করিম (সা.) এর কাছে আরজ করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাকে এমন কিছু আমলের কথা বলেন, যা করে আমি জান্নাতে যেতে পারবো। রাসূল (সা.) তাকে বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। ফরজ নামাজ কায়েম করবে। ফরজ জাকাত আদায় করবে। রমজানে রোজা রাখবে। এগুলো শোনার পর লোকটি বলেন, ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, আমি এর ওপর কোন কিছু বৃদ্ধি করবো না। রাসূল (সা.) বলেন, জান্নাতি লোক দেখতে চাইলে তাকে দেখ।’ (সগিহ বুখারী, হাদিস নম্বর-১৩৯৭)। উক্ত আলোচনা দ্বারা বুঝা যায়, জাকাত ইসলামের এমন স্তম্ভ, যা না থাকলে ইসলামের ভিত্তিই রচনা করা সম্ভব নয়। এ জন্য হজরত আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরোদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করেছিলেন। তাই জাকাত ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

জাকাত না দেয়ার ইহলৌকিক শাস্তি
জাকাত না দেয়ার কারণে ইহলোকিক শাস্তির কথা হাদিসে এসেছে। জাকাত না দেয়ার ইহলোকিক শাস্তি দু’ধরনের। কিছু হচ্ছে, শরীয়তের পক্ষ্য থেকে ধার্যকৃত শাস্তি। দ্বিতীয় হচ্ছে, পরিণামের দিক থেকে শাস্তি। যে ব্যক্তির মালে জাকাত ফরজ হওয়া সত্তেও আল্লাহ ও গরিবের হক আদায় করে না, দুনিয়াতেই তাদের কঠিন পরিণাম-ফল ভোগ করতে হতে পারে। এ ব্যাপারে হাদিস থেকে কিছু উদ্ধৃতি তোলে ধরা হচ্ছে।

১. ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা
হজরত বুরাইদা (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, কোনো জাতি জাকাত দেয়া বন্ধ করে দিলে আল্লাহ তায়ালা ওদেরকে দুর্ভিক্ষে নিমজ্জিত করেন। (ত্ববরানি, মুজামুল আওসাত হাদিস)।

২. বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, হে মুহাজির সম্প্রদায়! পাঁচটি বিষয় যখন তোমাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে আল্লাহ তায়ালা তার বিপরীতে তোমাদের পাঁচটি শাস্তি দিবেন। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি, যেন তোমরা সেগুলো না পাও। পাঁচটির অন্যতম ছিলো কোনো জাতি জাকাত দেয়া বন্ধ করে দিলে আল্লাহ তায়ালা আকাশে থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেন। যদি আল্লাহ সৃষ্টি নিরীহ প্রাণীগুলো না থাকতো তাহলে কখনো বৃষ্টি হতো না। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর-৪০৬৪)।

৩. জাকাত না দিলে মাল ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা
মূল সম্পদ থেকে হিসাব করে জাকাতের মাল আলাদা করা না হলে, জাকাতের অংশ মূল মালের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। হাদিসে এসেছে, হজরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, স্থল ও জলভাগে মাল নষ্ট হয় জাকাত আটকে রাখার কারণে। হজর আয়শা (রা.) থেকেও এ ধরনের হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, সদকার (জাকাত) মাল যে মালের সঙ্গেই মিশেছে, ওটাকে ধ্বংস করে ছেড়েছে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, জাকাত অধ্যায়, পৃষ্ঠা-১৫৭, আশরাফিয়া দেওবন্দ)

মুহাদ্দিসরা হজরত আয়শা (রা.) এর হাদিসের দু’টি ব্যাখ্যা করেছেন। (ক) জাকাতের অংশ পৃথক করে গরিব মিসকিনকে না দিলে, মূল মাল ধ্বংসের জন্য তা কারণ হতে পারে। (খ) জাকাত খাওয়ার উপযুক্ত না হয়েও জাকাত সংগ্রহ করে নিজের মালের সঙ্গে মিলালে তা মূল মাল ধ্বংসের কারণ হতে পারে। নষ্ট দ্বারা সাধারণ অর্থও উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার এই অর্থও হতে পারে যে, মাল নষ্ট হলে যেমন মালিক তা ব্যবহার করতে পারে না। তেমনি জাকাত না দেয়ার কারণে পুরো মালই ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে যায়।

জাকাত না দিলে শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি
জাকাত না দিলে ইসলামি রাষ্ট্র আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। রাসূল (সা.) বলেন, যে লোক নেকির আশায় জাকাত দিয়ে দেয়, আশা অনুযায়ী সে নেকি পেয়ে যাবে। আর যে জাকাত দেয়া থেকে বিরত থাকে, আমি তার থেকে জাকাত নেব এবং তার মালের অর্ধেকও নিয়ে নেব। (সুনানে নাসায়ী-২৪৪৪)। ইউসুফ আল কারজাবী এ প্রসঙ্গে বলেন, এই হাদিসে জাকাত সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বলে দেয়া হয়েছে।

১. জাকাত সম্পর্কে আসল কথা হচ্ছে, মুসলমান জাকাত দেবে নেকি পাওয়ার নিয়তে। এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করবে যে, এর মাধ্যমে আমি নেকি লাভ করবো।

২. সম্পদের মোহে পড়ে কোনো লোক যদি জাকাত দেয়া থেকে বিরত থাকতে চায় তাহলে তাকে সে অবস্থায় ছেড়ে দেয়া যাবে না। তার থেকে জোর করে জাকাত আদায় করতে হবে। যে জোর আসবে ইসলামি শরীয়ার সার্বভৌম ক্ষমতার বলে। রাষ্ট্র বা প্রশাসন শরীয়ার প্রতিনিধি হিসেবে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। এর সঙ্গে শাস্তিস্বরূপ তার অর্ধেক মাল নিয়ে নেয়া হবে। কারণ, জাকাত দিতে অস্বীকারের মাধ্যমে সে সম্পদে আল্লাহ তায়ালার হক থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করছে। এই শাস্তির কারণে অন্যরাও শিক্ষা গ্রহণ করবে। কেউ জাকাত দেয়া থেকে বিরত থাকবে না। বলা হয়েছে, ইসলামের সূচনালগ্নে এরূপ বিধান ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা বাতিল হয়ে যায়। আসলে এ কথার কোনো দলীল প্রমাণ নেই। কেবল সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে এরূপ কথা বলা যুক্তিসঙ্গতও নয়। আমি মনে করি এরূপ শাস্তির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের ইচ্ছাধীন। যখন, যেখানে দেখবে লোকেরা জাকাত দেয়া থেকে বিরত হচ্ছে, সেখানেই তা কার্যকর করবে।

৪. জাকাত আদায়ে এরূপ কঠোরতা করার কারণ হচ্ছে, সমাজের গরিব মিসকিনদের অধিকার আদায়ের বাধ্যবাধকতা। রাষ্ট্র গরিব মানুষের অধিকার আদায় করে দিতে বাধ্য (ফিকহুয যাকাত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৯৪)।

জাকাত না দেয়ার পরলৌকিক শাস্তি
হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, যে কারণে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়েছে, কিন্তু সে জাকাত আদায় করেনি তাহলে তার শাস্তি হচ্ছে, কেয়ামতের দিন মাল-সম্পদ একটা বিষধর সাপের আকৃতি ধারন করবে, ওই সাপের দু’টি চোখের ওপর কালো চিহ্ন থাকবে এবং তা দিয়ে মালা পরিয়ে দেয়া হবে। তখন ওই সাপ জাকাত অনাদায়কারী ব্যক্তিকে দংশন করতে থাকবে আর বলবে, ‘আমিই তোমার মাল, আমিই তোমার ধন-সম্পদ’। আখেরাতের এই ঘটনা বর্ণনার পর, সম্পদশালীদেরকে সতর্কতা স্বরূপ রাসূল (সা.) এই আয়াত তেলাওয়াত করে শোনান ‘যারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের ব্যাপারে কার্পণ্যতা করে, ওরা যেন কার্পণ্যতাকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর না ভাবে। বরং কার্পণ্যতা ওদের জন্য ক্ষতিকর। যে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্যতা হচ্ছে, অচিরেই তা দিয়ে ওদের মালা পরিয়ে দেয়া হবে (সূরা : আল ইমরান, আয়াত : ১৮০)।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস নম্বর-১৪০৪)।

ইমাম মুসলিম (রাহ.) ও অনুরূপ একটি বর্ণনা এনেছেন। যার ভাষ্য হচ্ছে, ‘যে লোক স্বর্ণ-রূপার মালিক হয়ে তার ওপর ধার্যকৃত হক আদায় করবে না, কেয়ামতের দিন ওই স্বর্ণ-রূপাকে একটা চওড়া বস্তুতে রূপান্তর করা হবে। এরপর জাহান্নামের আগুন দিয়ে তা তাপ দিয়ে গরম করা হবে। সেই উতপ্ত বস্তু দিয়ে মালিকের পার্শ্ব, ললাট ও পৃষ্ঠে দাগ দেয়া হবে; ওই দিনে যার একদিন বর্তমান সময়ের পঞ্চাশ হাজার বছর সমপরিমাণে হবে। এরপর লোকদের মাঝে বিচারের চূড়ান্ত ফয়সালা চলে আসবে। তখন তাকে তার পথ দেখিয়ে দেয়া হবে। তার পথ হবে হয়তো জান্নাতের দিকে বা জাহান্নামের দিকে। গরু-ছাগলের মালিকদেরও শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। তারা যদি ধার্যকৃত হক আদায় না করে তাহলে কেয়ামতের দিন ওগুলোকে অনাদায়কারী ব্যক্তির সামনে উপস্থিত করা হবে। পশুগুলো পায়ে ওদেরকে পিষ্ট করবে, সিং দিয়ে গুঁতা দেবে। পর্যায়ক্রমে যখন পশু শেষ হয়ে যাবে, শুরুর পশুগুলোকে শাস্তির জন্য আবার ফিরিয়ে আনা হবে। এরূপ শাস্তি চলতে থাকবে বিচারের আগ পর্যন্ত। ওই সময়ের এক দিন বর্তমান সময়ের পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে। এরপর তাকে জান্নাত বা জাহান্নামের রাস্তা দেখিয়ে দেয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর-৯৮৭)।