সাফল্য দুধ-ডিম-মাংস উৎপাদনে

সাফল্য দুধ-ডিম-মাংস উৎপাদনে

নিউজ ডেস্ক: ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা মানুষ হত্যার পাশাপাশি এ ভূখন্ডের লাখ লাখ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি জবাই করে খেয়ে ফেলে। আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। যুদ্ধে জয় পেলেও চরম খাদ্য সংকটে পড়ে বাংলাদেশ নামের নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র। যুদ্ধের পর থেকে আশির দশকে এসেও দেশে মাথাপিছু দৈনিক দুধের প্রাপ্যতা ছিল ৩০ মিলির কম। অধিকাংশ নি¤œবিত্ত পরিবারে সপ্তাহে বা ১৫ দিনের মধ্যে এক দিন রান্না হতো মাংস; তাও যৎসামান্য। ডিম খাওয়া হতো ভাগাভাগি করে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনপ্রতি দৈনিক দুধের প্রাপ্যতা বেড়ে হয়েছে ১৭৬ মিলি। এ ছাড়া সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে ডিম ও মাংস। পুষ্টি চাহিদা পূরণ হওয়ায় বাড়ছে গড় আয়ু। বাড়ছে মানুষের কর্মক্ষমতা। জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার গবাদিপশু (গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া) ও ২ কোটি ১০ লাখ হাঁস-মুরগি ছিল। যুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা প্রায় ২৫ ভাগ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি জবাই করে খেয়ে ফেলে (তথ্যসূত্র : দৈনিক বাংলা, ২৬ জানুয়ারি, ১৯৭২)। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দেখা দেয় খাদ্য ও পুষ্টি সংকট। সেই বাংলাদেশে এখন চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে মাংস ও ডিম। ২০২০ সালে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার ও হাঁস-মুরগি ৩৫ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার। জাত উন্নয়নের ফলে গরু-মহিষের দুধ উৎপাদন বেড়েছে ৬ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে স্থিরমূল্যে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ প্রত্যক্ষ ও ৫০ ভাগ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (খামার) ড. এ বি এম খালেদুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত চার বছর ধরে শতভাগ দেশি গরু দিয়ে পূরণ হচ্ছে কোরবানির পশুর চাহিদা। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন হয় ১০ লাখ মেট্রিক টন, মাংস উৎপাদন হয় ৫ লাখ মেট্রিক টন ও ডিম উৎপাদন হয় ১৫০ কোটি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন, মাংস উৎপাদন হয় ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন ও ডিম উৎপাদন হয় ১ হাজার ৭৩৬ কোটি। সবগুলোই ১০ গুণের বেশি বেড়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। জনপ্রতি দৈনিক ২৫০ মিলি ধরে দুধের চাহিদা পূরণে এখনো ৪৬ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি থাকলেও গত ১০ বছরেই দুধের উৎপাদন সাড়ে তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে দেশে মোট দুধের চাহিদা ছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় ২৯ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৯-২০২১ অর্থবছরে দুধের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫২ লাখ ২ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। ১০ বছরের ব্যবধানে চাহিদা বেড়েছে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদন বেড়েছে ৭৭ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। বছরে জনপ্রতি ১০৪টি ডিম ধরে ২০১০-১১ অর্থবছরে ডিমের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৫৩৯ কোটি ২০ লাখ। উৎপাদন ছিল মাত্র ৬০৭ কোটি ৮৫ লাখ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩২ কোটি ৬৪ লাখ। উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৭৩৬ কোটি, যা চাহিদার চেয়ে বেশি। দৈনিক জনপ্রতি ১২০ গ্রাম ধরে ২০১০-১১ অর্থবছরে মাংসের চাহিদা ছিল ৬৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় মাত্র ১৯ লাখ ৯০ হাজার           মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চাহিদা বেড়ে হয় ৭২ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন। ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশে^ চতুর্থ আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চম।
এ ছাড়া সস্তায় সব শ্রেণির মানুষের জন্য আমিষের জোগান দিচ্ছে পোলট্রি শিল্প। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, পোলট্রি খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের। পোলট্রি শিল্পের ওপর ভর করে সারা দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মিনি চাইনিজ, ফাস্টফুডের দোকান ও ফুডকোর্ট। পোলট্রি শিল্পে উৎপাদিত মাংসের বড় একটি অংশই বিক্রি হচ্ছে এসব খাবারের দোকানে। আর এই খাতেও কর্মসংস্থান হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের। এর বাইরে বর্তমানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোয়েল, কবুতর ও টার্কি খামার।