পাটের ভাল দামে কৃষকের মুখে হাসি ॥ শঙ্কা কেটে গেছে

পাটের ভাল দামে কৃষকের মুখে হাসি ॥ শঙ্কা কেটে গেছে

সব শঙ্কা কাটিয়ে এবার হাসি ফুটেছে পাট চাষীর মুখে। মৌসুমের শুরুতেই দেশের বহুল আলোচিত সোনালি আঁশ পাটের ভাল দাম পাওয়ায় চাষী বেজায় খুশি। বর্তমানে তারা প্রতিমণ পাট বিক্রি করছেন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে। এতে প্রতিবিঘায় শুধু পাট বিক্রি করেই কৃষক লাভবান হচ্ছেন ১৩ থেকে ১৭ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে পাটখড়ির দাম যুক্ত করলে প্রতিবিঘায় এখন কৃষকের লাভ হচ্ছে ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা। সরকারী পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার পাটের দাম নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন চাষী। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই ভাল দাম পাওয়ায় সব শঙ্কা নিমিষেই উড়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলগুলো যথাযথ মূল্যে পাট কেনা শুরু করায় পাট চাষ করে কৃষক এবারও ভালই লাভের মুখ দেখছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাটের বাজারের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাট-বাজাওে মান ভেদে প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে সারাদেশের কৃষকই এবার পাট বিক্রি করে খুব খুশি।

তিন/চার বছর ধরেই কৃষক পাটের দাম ভাল পাচ্ছে। গত বছর মৌসুমের শুরুতে ১৫০০-১৬০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হলেও পরে দুই হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন তারা। পাটের বাজারের সেই উর্ধমুখী ধারাবাহিকতা এবারও বজায় রয়েছে। ফলে কৃষক মৌসুমের শুরু থেকেই পাটের দাম ভাল পাচ্ছে।

মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার রায়পুর গ্রামের চাষী আশরাফ আলী জানান, গত বছর তিন বিঘা জমিতে চাষ করে ৫০ মণ পাট পেয়েছিলেন। সে সময় মণপ্রতি গড়ে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে পাট বিক্রি করেছিলেন তিনি। এবারও তিন বিঘা জমিতে আবাদ করে প্রতিবিঘায় পাট পেয়েছেন ১০ মণ করে। এই পর্যন্ত তিনি প্রতিমণ পাট বিক্রি করেছেন ২ হাজার ২০০ টাকা দরে। তিনি আশা করছেন, সব খরচ বাদে এবার তার কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাভ হবে।

জানা যায়, ক্ষুদ্র পাইকার ব্যবসায়ীরা সাইকেল ও ভ্যানযোগে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাট সংগ্রহ করছে। আবার বেসরকারী পাটকলগুলোর জন্য দূরের পাট ব্যবসায়ীরা হাটে এসে পাট কিনছেন। এ বিষয়ে কৃষকরা বলছেন, পাটের প্রস্তুতি শেষ না হতেই তাদের বাড়ি থেকে পাট সংগ্রহ করছে পাইকাররা। কৃষকের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে ১ বেল পাট ১০ হাজার টাকায় ক্রয় করছে। যার কারণে কৃষক বেশ খুশি।

মানিকগঞ্জ বাজারের পাট ব্যবসায়ী শামসুল আলম খান জানান, বর্তমান বাজারে প্রতিমণ দেশী পাট ১ হাজার ৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা এবং তোষা পাট ২ হাজার ২শ’ থেকে ২ হাজার ৪শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটের ফলনও ভাল। পাটের বর্তমান বাজারদর ও বিভিন্ন মিলে চাহিদা থাকায় চাষীর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। বাজারদর এভাবে থাকলে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থানার সোনামুখী গ্রামের পাটচাষী আব্দুল মান্নান বলেন, এবার পাটের যেমন ভাল দাম তেমনি পাটখড়িরও ভাল দাম পাওয়া যাচ্ছে। এবার মৌসুমের শুরুতেই দুই হাজার টাকার ওপর উঠেছে পাটের দাম। তিনি বলেন, অনেকদিন পর পাট আবাদ করে লাভের মুখ দেখলাম। তিন বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছি। যে দাম আছে তাতে খরচ বাদ দিয়ে ধানের চেয়ে বেশি লাভ হবে।

ফরিদপুরের পাটচাষী মোঃ আপেল বলেন, আমি দুই হাজার ২৫০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছি। দুই/তিন বছর ধরে পাটের ভাল দাম পাওয়া যাচ্ছে। পাটের সঙ্গে সঙ্গে পাটখড়ির চাহিদাও বাড়ছে। সব মিলে চাষীরা খুশি।

চাষীরা জানান, প্রতি বিঘা জমি থেকে যে পরিমাণ পাটখড়ি পাওয়া যায় তা ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। মৌসুমে প্রতিমণ পাটখড়ি বিক্রি হয় ১৮০-২০০ টাকা দরে। যখন মৌসুম থাকে না তখন দাম পড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দিন দিন দেশে পাটখড়ির চাহিদা বাড়ছে। পাটখড়ি পুড়িয়ে তার ছাই থেকে চারকোল তৈরি হয়। তারপর সেই চারকোল চীনে রফতানি হয়। চীনের পাশাপাশি বর্তমানে তাইওয়ান ও ব্রাজিলেও এটি রফতানি হচ্ছে। বিদেশে পাটখড়ির ছাই থেকে মূল্যবান নানা পণ্য তৈরি হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। এ খাত থেকে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকা। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার ধরতে পারলে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সহজেই আয় করা সম্ভব। দেশে চারকোল শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। এর পর থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাটখড়ি থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোটবড় মিলিয়ে ৪০টির মতো চারকোল ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। একটি কারখানায় দৈনিক ৫০০ মণ পাটখড়ির চাহিদা রয়েছে। জুন-জুলাই দুই মাস ছাড়া সারাবছর মিল চালু থাকে। একটি কারখানায় মাসে ১৫০-২০০ টন ছাই উৎপাদন হয়। প্রতিটন ছাই বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হয়।

প্রতিহেক্টর জমিতে পাটখড়ি হয় প্রায় ২৫০ মণ। মৌসুমে এই পাটখড়ি বিক্রি করেই ৫০ হাজার টাকা আয় করা যায়। আর মৌসুমের পর বিক্রি করতে পারলে আরও বেশি লাভ হয়। ফলে পাট এবং পাটখড়ি মিলিয়ে পাট এখন কৃষকের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে।

পাটপ্রধান জেলাগুলোতে এখন কৃষক পাট নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। কোথাও তারা পাট কাটছেন ও আবার অনেকস্থানে পাট জাগ দিচ্ছেন। অনেকে আঁশ ছাড়িয়ে, পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে বাজারে নিচ্ছেন বিক্রির জন্য। পাট চাষের প্রধান সমস্যা হলো আঁশ পচানোর পানি। অন্য বছর কৃষক পাট নিয়ে পানির পেছনে ছুটলেও এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়াতে তারা পাট ক্ষেতেই জাগ দেয়ার কাজ সারছেন।

কৃষকরা জানান, পাট মূলত বৃষ্টিনির্ভর ফসল। মৌসুমের শুরুতে এবার বৃষ্টি হয়নি। তখন পাটগাছের বৃদ্ধি কিছুটা কম হয়েছে। পাট কাটার সময় প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় পাট জাগ দিতে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। এতে পরিবহন ব্যয়ও সাশ্রয় হয়েছে। সব মিলিয়ে এবার পাট চাষে খরচ অনেক কম হয়েছে।

মাগুরার মোহম্মদপুর সদর উপজেলার পারলা গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, অন্যবারের তুলনায় এবার পাট ভাল হয়েছে। দেড়বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। গত বছর পানির জন্য পাট জাগ দিতে পারিনি। পাট চাষের মাঝামাঝি সময় তীব্র খরা হওয়ায় চাষ হওয়া পাটের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছিল। পরে বৃষ্টি হওয়ায় পাট চাষ ভাল হয়েছে। আশা করছি, এবার ভাল দামে পাট বিক্রি করতে পারব।

একই উপজেলার পুখরিয়া গ্রামের পাটচাষী নজরুল ইসলাম বলেন, গতবারের তুলনায় এবার ভাল দামে পাট বিক্রি করেছি। মোটামুটি ভাল পাট ২০০০-২৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা গতবারের তুলনায় ৫০০-৬০০ টাকা বেশি। কিন্তু গতবার পাটের দাম পড়ে যাওয়ায় আমরা ন্যায্য দাম পাইনি। ফলে উৎপাদন খরচ না ওঠায় আমাদের ক্ষতি হয়েছে। এ বছর ভাল দাম পাচ্ছি জন্য ভাল লাগছে।

মাগুরা নতুনবাজার পাট ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান বলেন, নতুন ওঠা পাট আমরা বিভিন্ন দামে ক্রয় করছি। মিলশার্ট ধূসর-কালো রঙের পাট ১৮০০-২০০০ টাকা, কোম্পানি শার্ট সোনালি রঙের পাট ২২০০-২৩০০ টাকা পর্যন্ত কৃষকের কাছ থেকে আমরা কিনছি। এবার পাটের দাম ভাল জানিয়ে তিনি জানান, গতবারের তুলনায় এবার পাটের দাম ভাল হওয়ায় কৃষকও খুশি। তবে কিছুদিনের মধ্যে পাটের দাম আরও বাড়তে পারে।

বিনোদপুর গ্রামের পাটচাষী আলম বিশ্বাস জানান, পাটের পাশাপাশি পাটকাঠিরও এবার দাম ভাল। দেড় বিঘা জমিতে আবাদ করে ১২ মণ পাট পেয়েছেন তিনি। তার সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকার মতো। তিনি শুধু পাটকাঠি বিক্রি করেছেন নয় হাজার টাকা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, খরচ কম হইছে। দাম ভাল পাচ্ছি।

বন্যায় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উচ্চফলনশীল বীজ ও আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এ বছর দেশে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভাল উৎপাদন হওয়ায় পাট চাষীও খুব খুশি। কৃষি অফিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটচাষ ভাল হয়েছে। প্রথমদিকে খরার কারণে পাট শুকিয়ে যাচ্ছিল। পরে বৃষ্টি হওয়াতে পাট গাছে সতেজতা এসেছে। অন্যবারের তুলনায় এবার পাটপ্রধান প্রতিটি জেলায়ই পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে।

পাট চাষীরা বলেন, এবার পাটের ফলন ও মান বেশ ভাল। প্রতিবিঘায় প্রায় ১০ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, গত বছর দেশে ৬৮ লাখ বেল (এক বেলের ওজন ১৮২ কেজি) পাট উৎপন্ন হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ৮২ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। মোট তিন লাখ ১৬ হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমিতে এবার পাটের আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক পাট কাটা হয়েছে। যদিও এবার ২৬ হাজার ৯৬ হেক্টর জমির পাট বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। তারপরও গত বছরের চেয়ে এবার পাটের উৎপাদন বেশি হবে বলে কৃষি দফতর আশা করছে।

কৃষি তথ্যসেবার সূত্র অনুযায়ী দেশের ৪০ লাখ চাষী পাট চাষ করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি মানুষের জীবিকা পাটকে কেন্দ্র করে। প্রতিবছর মৌসুমে গড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পান কৃষক। দেশের প্রায় সব জেলাতেই পাট উৎপন্ন হয়। তবে বেশি উৎপন্ন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলায়। এসব জেলার পাটচাষী এবার পাটের ন্যায্য দাম পেয়ে খুশি।

বাংলাদেশে বছরে উৎপাদিত পাট আঁশের শতকরা প্রায় ৫১ ভাগ পাট কলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, প্রায় ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় শতকরা ১২ ভাগ পাট চাষ এবং পাটশিল্প প্রক্রিয়াকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন কাজের সঙ্গে জড়িত।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার কৃষক ধানের যেমন ভাল দাম পেয়েছে, তেমনি পাটেরও ভাল দাম পাচ্ছে। তারা দুই হাজার থেকে শুরু করে দুই হাজার ৪০০ টাকা মণ পাট বিক্রি করছে। এটা খুব খুশির খবর। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এতে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্যের রফতানিও বাড়ছে। বিশ্বের বহু দেশই এখন পলিথিন বর্জন করছে। এই কারণেই আমাদেরও পাটপণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এ বছর পাটের দাম খুব একটা কমবে বলে মনে হয় না।

তারা বলেন, সরকারী জুট মিল বন্ধ হলেও বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ বিজেএমসি মৌসুমের শেষদিকে গিয়ে পাট ক্রয় করে। আর তারা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট ক্রয় করে না। তারা ফড়িয়ার কাছ থেকে পাট ক্রয় করে। আর অর্থ সঙ্কটে খুব স্বল্প পরিমাণে পাট ক্রয় করে। যা বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলে না। ফলে সরকারী মিল বন্ধের প্রভাব বাজারে পড়বে না। আবার তাদের রফতানির পরিমাণও খুবই কম। সরকারী মিলগুলো মোট পাটপণ্য রফতানির মাত্র ৪ শতাংশ রফতানি করে। সিংহভাগ পাটপণ্য রফতানি করে দেশের বেসরকারী খাত। তাই সরকারের উচিত হবে বেসরকারী খাতের জুট মিলগুলো যাতে চালু থাকে এবং পাটপণ্য উৎপাদন করে রফাতিন করতে পারে সেজন্য তাদের উৎসাহিত করা। তাহলেই কৃষ পাট আবাদ করে ভাল দাম পাবে।