করোনা যুদ্ধে নারী ইউএনও’র সাহসী পথ চলা!

করোনা যুদ্ধে নারী ইউএনও’র সাহসী পথ চলা!

মো: আব্দুল বারি খান, সম্পাদক ও প্রকাশক: নিয়ামতপুর উপজেলায় করোনা সংক্রমণ আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চলছে কঠোর লকডাউন। নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়া মারীয়া পেরেরা গলাফাটিয়ে সচেতন করাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নানা নির্দেশনার কথা বললেও মনে হচ্ছে অনেকের কানেই ঠুকছে না করোনা থেকে বাঁচার জন্য সরকারের এ সকল নির্দেশনাগুলো। এতো বুঝানোর পরও  গ্রামের রাস্তায় মানুষ চলাচল করছে ও ছোট খাটো যানবাহনগুলো দেদাছে চালাছে। বুঝানোই যাচ্ছে না কাগজে কলমে পড়া লেখা করা মানুষগুলোসহ গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলোকে। মানুষ যদি করোনার ক্ষতিকারক দিকগুলো মন থেকে আমলে নিতে পারতো তাহলে সরকারের নিদের্শ মানা ও জনসচেতনতাকে মহাঔষধ হিসেবে গ্রহন করত। আর এর ভয়ে মানুষ ঘরের জানালা পর্যন্ত খোলা রাখতো না। বাংলাদেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে বলেই অনেকেই বিনা প্রয়োজনে অযথা বাহিরে ঘুরাফেরা করছে এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না।

করোনা মহামারীর বিষ দাঁতের কামড় থেকে রক্ষা করতে উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে একযোগে কাজ করছে। তবুও কারো হুশ হচ্ছেনা।

নিয়ামতপুর উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে স্হানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে লকডাউন করেছেন। আক্রান্ত পরিবারগুলোকে সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং আত্নবিশ্বাসী করে তুলছেন স্থানীয় প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয় এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও গ্রাম পুলিশবৃন্দের সাথে চলমান অবস্থা নিয়ে মতবিনিময় করা হয় এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে সকলকে সচেতন থাকার জন্য অনুরোধও করা হচ্ছে উপজেলার প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করায় জরিমানা করা হচ্ছে।

স্থানীয় এলাকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রম বেগবান করাসহ নানাভাবে জরুরি মতবিনিময় করছেন উপজেলা প্রশাসন।

সকল ইউপি মেম্বারকে ওয়ার্ড কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা অব্যাহত রাখার জন্য ও আক্রান্তের বাড়ি লকডাউন নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে উপজেলা প্রশাসনের তরফ থেকে। সেই সাথে নিরাপত্তা জোরদার করছেন থানা পুলিশ বিভাগের সদস্যরা। পাশাপাশি চাঁপাই সহ আক্রান্ত এলাকাগুলোতে আসাযাওয়া না করার বিষয়ে সকলকে সচেতন করতেও বলা হচ্ছে।

এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে লকডাউন চলমান থাকায় মাকলাহাট-দীঘা সড়ক দিয়ে লুকিয়ে যানবাহন চলাচল করার অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন অফিসার ইনচার্জ হুমায়ুন কবীরের নের্তৃত্বে সেই সকল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সকলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতেও বলা হচ্ছে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

দিনে দিনে আক্রান্তের হার বাড়ছে। ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয়টি হলো আমাদের হোটেল রেস্তোরাঁ চায়ের দোকানে হরেক রকম মানুষ আসে। এমনকি বিদেশে ফেরৎ ব্যক্তিও কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম ভেঙে সন্ধ্যায় চা খেতে আসতে পারে। তার মাঝেও জীবাণু থাকতে পারে। যদি এসব খোলা থাকে তাহলে মানুষ একত্রিত হবেই। কতক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখা যাবে? যেখানে জরিমানার ভয় দেখিয়েও কোয়ারান্টাইনে রাখা যায়না। আর এরাতো মুক্ত! একই কাপে, গ্লাসে, প্লেটে কত জনে খাচ্ছেন। একই চেয়ারে, বেঞ্চে কত জন পর পর বসছেন। এতে যে কি ভয়ানক ঝুঁকি আছে কল্পনাও করতে পারবেননা! এ ভাইরাস স্পর্শের মাধ্যমে নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ে। তাই সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ ছাড়া শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সেই জন্য নিয়ামতপুরউপজেলাসহ সব জায়াগায় খাওয়ার হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং চায়ের স্টলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বরেন্দ্র পার্ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দোকান খোলা রাখার অভিযোগে উপজেলার কাঠপট্টিতে অভিযানে যান উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়া মারীয়া পেরেরা। সেখানে গিয়ে দেখেন, দরজায় বড় বড় তালা ঝুলছে। দোকানদার বাইরেই ছিলেন। ইউএনও’র জিজ্ঞাসায় দোকানী বললেন, দোকান বন্ধই আছে। তারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করবেন না। ইউএনও জয়া মারীয়া পেরেরা সচেতনতামূলক কিছু পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়ে চলে যাওয়ার মহুর্তে তার কানে আওয়াজ ভেসে এলো "স্যার, দোকানের ভিতরে লোক আছে"। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিষয়টি একটু বুঝতে পেরে দোকানদারকে বললেন, দোকানের তালা খোলেন। দোকানদার মৃদু হেসে বলে উঠেন চাবি নাই, স্যার। চাবি বাসায় স্যার। করোনা যুদ্ধে সাহসী পথ চলা নারী ইউএনও জয়া মারীয়া পেরেরা অনেক ধৈর্যের সাথে দোকান মালিককে চাবি বাসা থেকে আনিয়ে দোকানের তালা খুলে দুজন কর্মচারীকে বের করা হলো! মোবাইল কোর্টে মালিকের জরিমানা করেন তিনি। তাকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হলো। সাধু সাবধান যারা ভাবছেন তালা পদ্ধতি বেশ নিরাপদ তাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। এ ধরণের মানসিকতা হতে বিরত থাকুন।
অনেকেই সব বুঝেও অবুঝ হয়ে প্রশাসনের সাথে মানুষ বেহায়ার মতো লুকোচুরি খেলছে। কঠোরতা থেকে যদি ভাল কিছু হয়, তবে কঠোরতাই ভাল। সেই পথেই হাঁটছেন করোনা মোকাবেলায় সন্মুখ সারির সাহসী যোদ্ধা নারী ইউএনও জয়া মারিয়া পেরেরা। সঙ্গে কাজ করছেন এসি (ল্যান্ড) ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নীলুফা সরকারও।

সাহসী নারী ইউএনও রাতে নিয়ামতপুর এবং হাজীনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার সার্বিক অবস্থা পরিদর্শন করাকালে সরকার বিধি নিষেধ আরোপ করেছেন আর বলছেন, আপনারা যদি দিনের বেলা কোনমতে বিধি নিষেধ সহ্য করে সন্ধ্যা বেলা চায়ের দোকানে বা পাড়ার মোড়ে মোড়ে দল বেঁধে এসে পরিবেশটা চায়ের চেয়েও গরম করে ফেলেন তাহলে কি লাভ?  এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কত বেশি বাড়ে আন্দাজ করতে পারেন কি?  রাতের আড্ডায় যাদের দেখা যাচ্ছে তারা প্রায় শতভাগ লোকের মুখেই মাস্ক নেই! অন্ধকার হয়ে এলে মুখের মাস্কগুলো হারিয়ে যায়! দোকান খোলা আর দোকানের সামনে বসেই আড্ডা। আশেপাশে বাঁশের বেঞ্চগুলোতে অনেক সমাগম। 'মাস্ক' সে তো বহুদূরের বিষয়! দু:খের সাথে এমন মন্তব্যও করেন ইউএনও জয়া মারীয়া পেরেরা।

করোনা পরিস্থিতি থেকে মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টায় বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে ইউএনও কঠোর হয়েছেন। আড্ডা দেয়ার বাঁশের বেঞ্চগুলো স্হানীয় যুবকদের সহায়তা নিয়ে সাহসীকতার সাথে অপসারণ করেছেন। করোনা পরিস্থিতিতে এ বেঞ্চগুলো উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করতো বলে মনে করে। হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে জনসাধারণকে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করছেন তিনি। নিয়ম ভাঙ্গা মানুষদের নিয়মের ফ্রেমে আনতে একদিকে জরিমানা করছেন অন্য দিকে

লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মহীন মানুষগুলোকে সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের ব্যবস্হাও নিচ্ছেন ওই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি বলছেন, অবুঝ লোকগুলোকে বাঁচাতে হলে তাদের করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে বুঝাতে হবে।

এজন্য আমাদের যুব সমাজ এবং সচেতন নাগরিকবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় করোনা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে একটু কঠোর হতে হবে। কঠোরতা থেকে যদি ভাল কিছু হয়, তবে কঠোরতাই ভাল।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়া মারিয়া পেরেরা তার এক ট্যাটাসের একাংশে বলেন, আসুন, আমরা মনোবল শক্ত রাখি। এটা একটা যুদ্ধ। ভয়ানক একটা ছোঁয়াচে ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের অঘোষিত যুদ্ধ। আমাদের যুদ্ধ কৌশল হলো আমরা এ ভাইরাসকে আমাদের শরীর স্পর্শ করতে দিবনা। তার জন্য যত ধরণের নিয়ম আছে তা পালন করে যাব৷ সাময়িক কষ্ট হলেও তা করব।

মনে রাখবেন, অগ্নিকান্ডে শেষ সম্বলটুকু ভস্মীভূত হওয়ার পরও একজন মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। সুতরাং মনোবল হারানো যাবেনা।

করোনা পরিস্হিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিগণসহ সংশ্লিষ্টরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের সহযোগিতা করুন। সরকারি নির্দেশনার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার নিয়মকানুন মেনে চলুন। অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাঘুরি করবেন না। মনে সাহস রাখুন। অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলো আসবেই।

সারা বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে মহামারি করোনা থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশ সরকারের নিদের্শনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ সারা দেশের জেলা-উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, তথ্য অফিস, সেনাবাহিনী, র‌্যাব দেশের সর্বস্তরে জনসচেতনতামূলক নানা নিয়মকানুনসহ যেভাবে প্রচার-প্রচারনা করা হচ্ছে সেটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে। আবার এসকল কার্যক্রমসহ নানা ধরনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে জনস্বার্থে সরকারকে তাৎক্ষণিক অবগত করছে সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিএসবিসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরগুলো। তারা নিজের জীবনের, পরিবার পরিজনের মায়া ত্যাগ করে আতংকের মাঝে থেকে আপনাদের জন্য নিবেদতি প্রাণ হিসেবে সন্মুখ সারির যোদ্ধার আসনে বসে কাজ করে যাচ্ছেন।

করোনার থাবায় কেহ মারা গেলে তার কাছে আপনি যেতে ভয় পাচ্ছেন। অথচ যে করোনায় মানুষ মারা যাচ্ছে সেই করোনার ভয় আপনার মধ্যে ঢুকছেনা কেন? আপনি যদি এভাবে  সরকার তথা প্রশাসনের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে বেপরোয়াভাবে চলাফেলা করতে থাকেন তাহলে আপনার জন্য আগামীতে ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে। আপনি কি আপনার এলাকায় করোনা তান্ডবে ঘায়েল করা মানুষের মৃত্যুর মিছিল দেখতে চান? সাধু সাবধান এখনো সময় আছে। গায়ের জোরে এতো কিছু না করে সরকারী সকল নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক আপনার আগামী প্রজন্মের জন্য জীবনকে নিরাপদ রাখুন। অন্যথায় নিভে ও ধুলিষ্যাত হয়ে যাবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত আশা ভরসা। আগের যুগের মানুষ হয়তোবা না খেয়ে মরেছে। কিন্ত বর্তমান যুগের মানুষগুলোকে এখন আর না খেতে মরতে হয়না। এ ব্যাপারে সরকার অনেক দায়িত্বশীল।