সড়ক-বিদ্যুতে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি জনপদ

সড়ক-বিদ্যুতে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি জনপদ

দুর্গম পাহাড়ের বুকে পিচঢালা সুগম পথ। সবুজের মাঝে অজগরের মতো আঁকাবাঁকা সড়ক যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি তা পাল্টে দিয়েছে পাহাড়ি জীবনও। গত এক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় সোয়া চারশ কিলোমিটার (কিমি) নতুন রাস্তা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের আওতায় এসেছে ৫৫ ভাগ পরিবার। কাজ চলছে শতভাগ বিদ্যুতায়নের। এতে জীবনমান পাল্টে গেছে এ এলাকার ১৬ লাখ মানুষের।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার জালিয়াপাড়া থেকে সিন্দুকছড়ি হয়ে মহলছড়ি পাহাড়ের বুকে আঁকাবাঁকা ২২ কিমি পথ। একসময় স্থানীয়ভাবে চাঁন্দের গাড়ি নামে পরিচিত জিপ গাড়িই ছিল এখানকার মানুষের অবলম্বন। যে পথ পাড়ি দিতে আগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগত, সড়কটি চালু হওয়ায় এখন সময় লাগে মাত্র ত্রিশ মিনিট। খাগড়াছড়ির গুইমারা, লক্ষ্মীছড়ি ও মহলছড়ি উপজেলার ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ এ সড়কটি ব্যবহার করছে। রাঙামাটির মানুষও ব্যবহার করছে এ সড়কটি।

দুদিন সরেজমিন ঘুরে প্রত্যন্ত পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের এ চিত্র দেখা যায়। শুধু জালিয়াপাড়া-মহলছড়িই নয়, পার্বত্য এলাকার তিন জেলাতেই হয়েছে নতুন রাস্তা। গত এক দশকে খাগড়াছড়িতে নতুন সড়ক হয়েছে ৬০ কিমি। বান্দরবানে হয়েছে ৩০০ কিমি। এ জেলায় সংস্কার হয়েছে আরও ৩৭৫ কিমি সড়ক। রাঙামাটিতে নতুন সড়ক হয়েছে ৫৫ কিমি, সংস্কার করা হয়েছে ১৫৩ কিমি সড়কপথ। এর পাশাপাশি চলছে ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ।

এ সড়কটি পাহাড়ের তিন জেলার ছয়টি উপজেলাকে সংযুক্ত করবে। ২০২৮ সালে এ সড়ক নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। সীমান্তে এমন ১ হাজার কিমি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য এলাকায় সড়ক যোগাযোগে বড় পরিবর্তন এনেছে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত প্রায় দুই কিমি দৈর্ঘ্যরে মৈত্রী সেতু। সেতুটি হওয়ায় খাগড়াছড়ির রামগড়ে পার্বত্য এলাকার প্রথম স্থলবন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। এটি চালু হলে ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে এ এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থাপিত হবে। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ^^াস বলেন, এ সেতুকে কেন্দ্র করে রামগড় স্থলবন্দরের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে এ অঞ্চলের আমদানি-রফতানি বাড়বে। এ সেতু খাগড়াছড়ি জেলার মানুষের জন্য একটি পজিটিভ কানেকটিভিটি তৈরি করবে।
সাজেক আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর কাজী মোস্তফা আরেফিন বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক নির্দেশনায় জালিয়াপাড়া-মহলছড়ি রাস্তাটি হওয়ার পর এ এলাকার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন খাগড়াছড়ি থেকে অতিদ্রুত সাজেকে আসা যায়। অতিদ্রুত যাতায়াত করার কারণে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

চার ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সাজেকে থাকেন প্রভাত চন্দ্র (৭০)। নিজের পাহাড়ি জমিতে কলা, আম, হলুদ, আদা ও কাঁঠাল চাষ করেন। তিনি বলেন, আগে এ এলাকা জঙ্গল ছিল। আগে এখান থেকে ফলমূল খাগড়াছড়ি নিয়ে যেতে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা লাগত। এখন আমরা চার-পাঁচ ঘণ্টায় খাগড়াছড়ি যেতে পারি। এখন সকালে মাল (পণ্য) নিয়ে গেলে বিকালে ফিরে আসতে পারি।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, পঁচাত্তরের পর পরবর্তী ২১ বছরে পাহাড়ের উন্নয়নে কেউ কাজ করেনি। দুই দশক পাহাড়ে যে যুদ্ধ হয়েছে; বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তা হতো না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার নয় মাসের মাথায় শান্তিচুক্তি হয়। গত ১২ বছরে পাহাড়ের সবক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। আমরা কখনও এটা চিন্তা করতে পারিনি। বিদ্যুৎ ছিল না। রাস্তা ছিল না। এখন সব হয়েছে।

গত এক দশকে পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগের সুবিধার কথা বলেন খাগড়াছড়ি ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুলতান মাস্টার। একই কথা বলেন ফলদ বাগান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিবাকর চাকমাও।

বিদ্যুতের আওতায় ৫৫ ভাগ মানুষ : কুপি বাতি আর হারিকেনের দিন শেষ। বিদ্যুতের আলোয় বদলে যাচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান। এগিয়ে চলছে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ। কর্মকর্তারা বলছেন, এখানকার ৫৫ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। দুর্গম এলাকাকে সোলার পদ্ধতির মাধ্যমে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনার কাজ চলছে।

কিছুদিন আগেও সন্ধ্যা নামলে পাহাড়ের যেসব পরিবার তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ঘুমিয়ে যেত। এখন সেখানে বিদ্যুতের আলোয় চলে শিশুদের পড়ালেখা, পারিবারিক বিনোদন।
সরেজমিন দেখা যায়, খাগড়াছড়ির আলুটিলার ত্রিপুরাপাড়ায় ঝলমলে আলো। এখানকার সুজাতা ত্রিপুরার এক ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি বলেন, আগে এখানে বিদ্যুৎ ছিল না। আমার বাচ্চাদের পড়াশোনায় সমস্যা হতো। বিদ্যুৎ আসায় বাচ্চারা রাত জেগে পড়তে পারছে। আমাদের খুব ভালো হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, গেল এক দশকে খাগড়াছড়িতে ৫২ হাজারেরও বেশি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সঞ্চালন লাইন তৈরি হয়েছে ১ হাজার কিমি। বাকি দুই পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে ৪৫ হাজার গ্রাহককে নতুন সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে এখানকার ৬৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সেবার আওতায় এসেছে। বান্দরবানেও ৬৫ শতাংশ মানুষ এসেছে বিদ্যুৎ সেবার আওতায়। এখানে ৩২ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। আর দুর্গম এলাকায় যাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুতের আওতায় এসেছে ১১ হাজার পরিবার। নতুন আরও ৪০ হাজার পরিবার আসবে এ কাজের আওতায়।

খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ আসাতে আধুনিক সব প্রযুক্তিও পৌঁছেছে পার্বত্য এলাকায়। শুধু দিনবদল নয়; সুযোগ তৈরি হয়েছে আয়েরও। ছোট ছোট কল-কারখানা, বৈদ্যুতিক চার্জে চলে এমন যানবাহন চালানোও অনেকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।