টিকা উৎপাদনে সক্ষম বাংলাদেশ

টিকা উৎপাদনে সক্ষম বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক: করোনাভাইরাসের টিকা উৎপাদনে সক্ষম বাংলাদেশ। সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ বেশ কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি আছে যাদের টিকা উৎপাদনের আগ্রহ, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। অন্য দেশ থেকে কিনে এনে টিকা দিতে খরচ বাড়ছে, সময়ও লাগছে। টিকা উৎপাদনে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মনোভাবের আভাস মিলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে টিকা সংকট সমাধানে দেশে উৎপাদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, বিশ্বের ১৫১ দেশে ওষুধ রপ্তানি ছাড়াও বিভিন্ন রোগের টিকা তৈরির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে। এ ছাড়া দেশেই এখন তৈরি হচ্ছে সিরিঞ্জ, নিডল, ক্যানোলা, গ্লাভস, নেবুলাইজার, ইসিজি মেশিন, আইসিইউ সরঞ্জাম থেকে শুরু করে অধিকাংশ চিকিৎসা-সামগ্রী।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘আশা করি এখন আর আমাদের টিকার সংকট থাকবে না। অনেক মাধ্যম থেকেই পর্যায়ক্রমে টিকা পেতে শুরু করেছি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরেরও সহায়তা নিচ্ছি। বিদেশ থেকে টিকা আনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য দেশেই টিকা উৎপাদন। এজন্য আমরা সরকারিভাবে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশে টিকা তৈরিতে প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে কাজ করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। দেশের একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে আগ্রহ নিয়ে কাজ করছে। বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টাসহ আরও একাধিক কোম্পানি আছে প্রক্রিয়ায়। তবে এখন পর্যন্ত ঠিক কোন প্রতিষ্ঠান কোন দেশের টিকা উৎপাদন করবে তা চূড়ান্ত হয়নি। এমনও হতে পারে একই দেশের টিকা এখানে একাধিক কোম্পানি তৈরি করতে পারে।’

 

জানা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রয়েছে বিভিন্ন রোগের টিকা তৈরির বিস্তর অভিজ্ঞতা। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দুটি শাখায় দুই ধরনের টিকা তৈরি হতো। একটি শাখায় কলেরা ও টাইফয়েড, অন্য শাখায় গুটিবসন্ত ও জলাতঙ্ক রোগের টিকা। প্রতিটি শাখার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল বছরে ৫ থেকে ৭ কোটি ডোজ টিকা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এ প্রতিষ্ঠানে জলাতঙ্ক রোগের টিকা উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদন চলে ২০১১ সাল পর্যন্ত। ১৯৭৮ সালে টিটেনাসের টিকা উৎপাদন শুরু করে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখে। ১৯৭৮ সালে ডিপথেরিয়ার টিকাও তৈরি হয়েছিল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) এর চাহিদা না থাকায় ১৯৮৭ সালে ডিপথেরিয়ার টিকা উৎপাদন বন্ধ করে দেয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। একসময় এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত টিকা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। করোনার এ ক্রান্তিকালে টিকা উৎপাদনে পুনরায় সক্ষম হয়ে ওঠার এখনই বাস্তবসম্মত সময়।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, ‘টিকা উৎপাদনে আমরা এখন সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু এখন যা করতে হবে তা হলো, টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে যে কোনো দেশের সঙ্গে বা সেই দেশের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা। তারা এসে আমাদের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট দেখবে। কী লাগবে তা নিরূপণ করবে। তাদের সহযোগিতা নিয়ে আমাদের এ প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তিনির্ভরতায় শক্তিশালী করতে হবে। এরপর আমরা টিকা উৎপাদন করতে পারি। এর অনেক সুফল আছে। তবে পৃথিবীতে খুব কম দেশেই এমন একটি ইনস্টিটিউট আছে। ইন্ডিয়ান সেরামের তুলনায় এটা অনেক উন্নতমানের প্রতিষ্ঠান। অতীতে এর অনেক গবেষণা অভিজ্ঞতা বিশ্বখ্যাত। তবে সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণায় এ প্রতিষ্ঠান অনেক পিছিয়ে।’

জানা যায়, দেশের ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সুনামের সঙ্গে বিশ্বের ১৫১ দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। দেশের সেরা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড, রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, এক্মি ল্যাবরেটরিজ বাংলাদেশ, এসিআই বাংলাদেশ লিমিটেড, অ্যারিস্টোফার্মা লিমিটেড, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ওষুধ রপ্তানি করছে উন্নত দেশগুলোয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটির রয়েছে টিকা তৈরির অভিজ্ঞতা। চীন, রাশিয়ার প্রযুক্তি এনে টিকা উৎপাদনের আলোচনা বেশ কয়েক মাস ধরেই চলছে। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ও চীনের সিনোফার্মের টিকা দেশে উৎপাদন নিয়ে আলোচনা চলছে কয়েক মাস ধরেই। বেশ কয়েকটি ওষুধ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান টিকা উৎপাদনে আগ্রহও দেখিয়েছে। স্পুটনিক-ভি ও সিনোফার্মের টিকা বাংলাদেশেই উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কোর কমিটি গঠন করেছিল। এ কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠানের টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা যাচাই করে নম্বর দিয়েছে।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ২৫ নম্বরের মধ্যে পেয়েছে ২১, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস ১২ আর হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ৫ নম্বর। ১৩ এপ্রিল ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে টিকা উৎপাদন করতে পারে এমন তিন প্রতিষ্ঠানের নাম পাঠান। তখন তিনি বলেছিলেন, স্পুটনিক-ভি উৎপাদনের জন্য অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে ইনস্পেটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সেলিম রেজা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ অবশ্যই টিকা উৎপাদনে সক্ষম। টিকা উৎপাদন করা যায় এমন ডেডিকেটেট ইনস্টিটিউড করা যেতে পারে। গ্লোব যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অনেক দেরিতে হলেও সরকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তারা এখন বানরের ওপর ট্রায়াল করছে। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ট্রায়ালও কিন্তু বানরের ওপরই হয়েছে। এটা বড় কোনো কঠিন কাজ নয়। আমি একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে বলব, বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোরও বিশ্বমানের সুবিধা আছে। সরকার ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর সদিচ্ছা থাকলে এটা সম্ভব।’ বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, ‘ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। বিশ্বের ১৫১ দেশে এ দেশের উৎপাদিত ওষুধ রপ্তানি হয়। ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় ৯৯ ভাগ ওষুধই দেশে উৎপাদন হয়। এ ওষুধ যদি বাইরে থেকে আমদানি করতে হতো তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে যেত। টিকা কিনতে গিয়ে যেমন খরচ হচ্ছে এবং অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকটির টিকা তৈরির অভিজ্ঞতা আছে। ইনসেপ্টা বিভিন্ন রোগের টিকা আগে থেকেই উৎপাদন করে। পপুলার, হেলথ কেয়ারের সক্ষমতা আছে টিকা তৈরির। বেক্সিমকো ডিসেম্বরের মধ্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে টিকা তৈরির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। ওষুধশিল্পের বিকাশের পাশাপাশি সরকারের খুব দ্রুত দেশে টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আমরা টিকার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরিতে সক্ষম। অন্য দেশ থেকে আমদানি করে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে টিকাদান করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।’

এদিকে দেশে উৎপাদনের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ টিকা আবিষ্কার। দেশে টিকা আবিষ্কারে কাজ করছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক। তাদের আবিষ্কৃত টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্স’ মানবদেহে ট্রায়ালের অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এ বছরের ১৭ জানুয়ারি ‘বঙ্গভ্যাক্স’ মানবদেহে পরীক্ষা চালানোর জন্য বিএমআরসির কাছে অনুমতি চেয়েছিল গ্লোব বায়োটেক। মানবদেহে ট্রায়াল চালানোর আগে শিম্পাঞ্জি ও বানরের ওপর টিকা প্রয়োগ করার পর তার কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে (বিএমআরসি) জমা দেওয়ার শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে।