নদীবন্দর ঘিরে সোনাগাজীতে অর্থনৈতিক বিপ্লবের হাতছানি

নদীবন্দর ঘিরে সোনাগাজীতে অর্থনৈতিক বিপ্লবের হাতছানি

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের পর এবার ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় নির্মিত হচ্ছে সোনাগাজী-কোম্পানীগঞ্জ নদীবন্দর। ইতোমধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। চলতি বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নৌবন্দর স্থাপনের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে এটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে গত ২৪ অক্টোবর সোনাগাজী-কোম্পানীগঞ্জ নদীবন্দর স্থাপনের প্রাথমিক গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে পরিবর্তন ঘটবে এলাকার আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায়।
বাংলাদেশ শিল্প উন্নয়ন পরিষদ, সোনাগাজীসহ কেন্দ্রীয় কমিটি বিভিন্ন সভা-সেমিনার করে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে নৌবন্দরের কাছে দাবি তুলেছেন। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর নৌ-মন্ত্রণালয়ে সোনাগাজী-কোম্পানীগঞ্জ নদীবন্দর স্থাপনের জন্য ডিও লেটার দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, সোনাগাজী-কোম্পানীগঞ্জ নদীবন্দর ঘোষণার জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাপ্ত প্রতিবেদন হতে জানা যায়, গত বছরের ৬ ও ৭ নভেম্বর সরজমিন পরিদর্শন করেছে গঠিত কমিটি। নদীবন্দরের পাশেই দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল অবস্থিত। এছাড়া স›দ্বীপ চ্যানেলে নাব্যতা ও প্রস্থতা থাকায় প্রস্তাবিত নদীবন্দরের তৃণভূমিতে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ফলে বাড়বে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যতা। সরকারের কোষাগারে যোগ হবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স›দ্বীপ চ্যানেলের ফেনী নদী মোহনায় বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর গড়ে উঠেছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বহু শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এ শিল্পাঞ্চল ঘিরে দেশীয় ছোট-বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। বঙ্গবন্ধু শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজনে সোনাগাজী উপকূলে দীর্ঘ রাস্তা ও ব্রিজের কাজ চলছে। উপজেলার বড়ধলী এলাকায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বন্দরের উপযোগিতার অনুকূলে বলা হয়, সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রজেক্ট সংলগ্ন ফেনী নদী ক্লোজারের পর হতে মোহনা পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য ট্রলারের মাধ্যমে পরিবাহিত হতে দেখা যায়। এছাড়া সোনাগাজী ও মিরসরাই সংলগ্ন ফেনী নদী স›দ্বীপ চ্যানেলে বেশ কয়েকটি ড্রেজার মেশিন ড্রেজিং অবস্থায় এবং মালামালবাহী কার্গো কোস্টার নোঙর করতে দেখা যায়।
অপরদিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ঘাট হতে বিভিন্ন ট্রলার ও নৌকার মাধ্যমে যাত্রী ও মালামাল নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ হতে স›দ্বীপ উড়িচর চলাচল করতে দেখা যায়।
এ অঞ্চলের নদীবন্দরের উপযোগিতা প্রসঙ্গে আরো বলা হয়, ফেনী নদীর ক্লোজার পর হতে মোহনা পর্যন্ত অংশে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা নিশ্চিত করা হলে গড়ে ওঠা বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালামাল পরিবহনে নিয়োজিত জাহাজগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই অঞ্চলে আশ্রয় নিতে পারবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ফেনী নদীর ক্লোজার হতে মোহনা পর্যন্ত অংশ শিপ শেল্টার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এ ব্যাপারে সোনাগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন বলেন, সোনাগাজী-কোম্পানীগঞ্জ নদীবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইবে। পাশাপাশি তা দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখবে। নৌবন্দর স্থাপন হলে নির্মিতব্য দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।
এছাড়া সড়কপথে পণ্য পরিবহনের চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। নৌবন্দর স্থাপন হলে এবং সোনাগাজীর উপকূলীয় এলাকায় একটি আউটার বেড়িবাঁধ বা মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করা হলে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জ হবে দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর। সেখানে শিল্প ও বন্দরের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।
নদীবন্দরের কার্যকারিতা সম্পর্কে রপ্তানি ও আমদানিকারক এনায়েত উল্লাহ বলেন, ফেনীতে স্থানীয়ভাবে কোনো শিল্পাঞ্চল নেই অথচ প্রকৃতির নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এখানে রয়েছে। নদীবন্দর গড়ে উঠলে শিল্পায়ন আরো বাড়বে। মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান হবে। এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলে উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। ফেনী সীমান্তবর্তী জেলা, তাই ত্রিপুরা অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হবে।
ফেনী চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আইনুল কবির শামীম বলেন, দেশের দক্ষিণ পূর্ব অংশে বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নদীপথে পণ্য খালাসে বাড়তি সুবিধা পাবেন। এতে পরিবহন ব্যয় অনেক কমবে।