পেশকারদের অনৈতিক লেনদেনে অতিষ্ঠ আইনজীবিসহ সেবা প্রত্যাশীরা

পেশকারদের অনৈতিক লেনদেনে অতিষ্ঠ আইনজীবিসহ সেবা প্রত্যাশীরা

বিচারব্যবস্থায় জনগণের হয়রানি দূর হোক (পর্ব ০১)

পেশকারদের অনৈতিক লেনদেনে অতিষ্ঠ আইনজীবিসহ সেবা প্রত্যাশীরা


সম্পাদক ও প্রকাশক,  মো. আব্দুল বারি খান: প্রথমেই বলে  নেওয়া ভালো, এই  লেখার উদ্দেশ্য  কোনোভাবেই আদালতকে অবমাননা করা নয় কিংবা আদালতের ভাবমূর্তি নষ্ট করা নয়। বরং আদালত অঙ্গনে বাহ্যিকভাবে  যেসব সমস্যা বিরাজমান, তা তুলে ধরা,  যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে আদালতের কার্যক্রম গতিশীল করে এবং সঠিক সময়ে জনগণের ন্যায়বিচারের পথ সুগম করে। 
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ যখন প্রতিপক্ষের দ্বারা কোন বিপদে পরে তখন দুনিয়ার ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় তারা আদালত চত্বরে কোর্টের আঙ্গিনায় এসে হাজির হয়। দুনিয়ার জগতে তাদের সর্বশেষ ও ভরসার স্থল  দেশের বিচারালয়গুলো। আর এখানে এসে তারা নানাভাবে হয়রানির স্বীকার হয়। অসহায়ত্বের ছাপ নিয়ে তারা যখন কোর্ট চত্বরে। তখন কোর্ট এলাকায় অসৎ উদ্দেশ্যে থাকা সংশ্লিষ্টদের স্টিমরোলারের যাতাকলে পরে নিস্পেষিত হচ্ছে মানব জীবন। নওগাঁর আদালত পাড়ার দু’চারজন সরকারি কর্মকর্তা/কৌসুলি/মুহুরীদের নানা আচরণে বিচার প্রার্থীরা হতভম্ব। শুধু বিচার প্রার্থীরাই/বাদিপক্ষ নয় দু’চারজন সরকারি কর্মকর্তা/কৌসুলি/মুহুরীদের আচার আচরণের দ্বারা বাদি পক্ষের সাথে আসা সাক্ষীদেরও নাভিষ্যাস উঠেছে। তাদের আচরনে বিচার প্রার্থীদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলে একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
দেশের বিচারাঙ্গনে কী হচ্ছে, জনগণ  সেখানে  ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কি-না এবং  সেসব  ভোগান্তির মাত্রা কত,  সে বিষয়ে সঠিক জরিপ চালানো হয় বা হচ্ছে বলে মনে হয় না। ফলে নিরীহ জনসাধারণের  ভোগান্তির মাত্রা দিনের পর দিন  বেড়েই চলেছে।
আদালত চত্বরে, আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার করে দিতে হচ্ছে; কিন্তু তবুও মামলার সুরাহা হচ্ছে না। এমনকি অতি সাধারণ একটি মামলা যা দুই-এক মাসে বা ছয় মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত,  সেক্ষেত্রেও একজন বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।
আর এজন্য অনেক মক্কেলরা মূলত দায়ী করছে আদালতের অসৎ পেশকার-কর্মচারীদের এবং কখনও কখনও তারা কোনো কোনো উকিলের বিরুদ্ধেও তারা একই অভিযোগের তীর ছোড়েন। ভুক্তভোগীরা বিটিবি নিউজকে বলেন, কিছু কিছু আইনজীবি নানা কারণে মক্কেলের পক্ষে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেন বলে তাদের অভিযোগ। যার ফলে মামলার  ক্ষেত্রে আদালতের  পেশকার-কর্মচারীরা বিমাতাসুলভ আচরণ করার সুযোগ  পেয়ে যান।
একশ্রেণির আইনজীবি ও  পেশাকারের  যোগসাজশেও নি¤œ আদালতের  কোনো  কোনো মামলায় দীর্ঘ  থেকে দীর্ঘতম তারিখ  ফেলা হয় বলেও জানা গেছে।  আর এসব  ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের অতি ব্যস্ততার সুযোগ গ্রহণ করা হয়। কারণ মামলার সংখ্যাধিক্যের কারণে বিচারকরা এত ব্যস্ত থাকেন  যে, অনেক  ক্ষেত্রেই  পেশকাররা নথিতে  যেমন তারিখ বসিয়ে  দেন,  তেমনিভাবেই তা ধার্য হয়ে যায় বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।
জানা  গেছে, আদালতের  বেশিরভাগ পিয়ন, পেশকার, জারিকারকরা ঘুষ ছাড়া  কোনো কাজই ঠিকমতো করতে চান না,  যেন এটি একটি অলিখিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় বিচারপ্রার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, পিয়ন-পেশকারদের কাছে বিচারপ্রার্থীরা মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নিতে  গেলে বা  কোনো সহযোগিতা চাইতে  গেলে তারা ঘুষ ছাড়া  কোনো কাজই করতে চান না। ফলে বাধ্য হয়েই ঘুষ দিতে হয়। 
বিটিবি নিউজের অনুসন্ধানের আয়নায় জানা গেছে, লেবাসধারী ওই সকল অসৎ উদ্দেশ্যে থাকা দু’চারজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী (পেশকার, পিয়ন, জারিকারক), কৌসুলি-মুহুরীরা আলাদভাবে বাদী-আসামী উভয় পক্ষকে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার আশায় মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার গুঞ্জন আছে। যা বিচারকেরা হয়তো জানে-ই না। আবার তাদের চাহিদা মাফিক অর্থ না পেলে বকাঝকাসহ খারাপ আচরণ করতে ভুল করছেনা তারা। হাজিরা বা জামিন পাইয়ে দেয়ার নামে তারা একটি অংশের টাকা আবার জামিন শুনানীর নামে মোটা অংকের টাকা আদায়ের ফন্দি ফিকির করে থাকে বলেও গুঞ্জন আছে। সরকারি সেবা প্রদানের নামে তারা সরকারি এ প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করছে অসৎ উদ্দেশ্যে ওঁত পেতে থাকা ওই সকল অসৎ ব্যক্তিরা। আবার ভুক্তভোগীরা তাদের টাকা না দিলে যদি কাজ না হয় সেক্ষেত্রে কখনও কখনও জোর করেও অনেকে টাকা দেয় বলেও গুঞ্জন আছে। তাদের অন্যায়ের লম্বা লাইনের ল্যাগাম টেনে ধরতে হবে। নানা কারণে সাহস করে কেউ কিছু বলতে পারে না। কখনও কখনও ওই সকল দু’চারজন অসৎ ব্যক্তিদের এধরনের খারাপ আচরণে বিচার প্রার্থী/আসামী/ভুক্তভোগীরা তাদের মনের আয়নায় জমানো কষ্টের লক্ষ কোটি তীরগুলো হৃদয়ের আঙ্গিনা থেকে বেড়িয়ে আকাশ পানে সৃষ্টি কর্তার বিচারের উপরে ছেড়ে দিয়ে সময়ের অপেক্ষায় দিন গুনছে তারা। 
গত ১৭ জুলাই একটি  সেশান মমলার ধার্য তারিখে আমি আদালতে উপস্থিত হই। ওই দিনই আদালতে মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত সরকারি  কৌঁসুলি  মোজাহার আলী আমাকে মামলার স্বাক্ষীদের জবানবন্দীসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করার পরামর্শ  দেন। ততক্ষনাথ ওই সরকারি  কৌঁসুলি এ্যাড.  মো.  মোজাহার আলীর সহযোগিতা চাইলে তিনি তার একজন প্রতিনিধিকে আমার সঙ্গে দিয়ে ফটোকপির খরচবাবদ শ’দুয়েক টাকা দিয়ে  পেশকারের নিকট  থেকে কাগজ পত্র সংগ্রহ করতে বলেন। তার পাঠানো প্রতিনিধি আমাকে সঙ্গে  নিয়ে অতিরিক্ত  জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের  বেঞ্চ সহকারি (পেশকার) মো. হাফিজার রহমান লেবু’র নিকট গিয়ে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ও অতিরিক্ত পিপি’র পরিচয় দিয়ে সহযোগিতার করার কথা বলেন।  পেশকার আমাদের কথাগুলো শুনে বলেন, মামলার স্বাক্ষীর জবানবন্দিসহ অন্যান্য কাগজপত্র নিতে হলে আমাকে ২ হাজার টাকা দিতে হবে। অতিরিক্ত পিপি’র কথা মতে ১ হাজার টাকার একটি  নোট দিয়ে সেখান  থেকে ফটোকপির খরচবাবদ ২শত টাকা নিতে বলা হলে  পেশকার রাগান্তিত হন এবং বলেন মামলার ৯জন স্বাক্ষীর কাগজপত্র নিতে হলে আমাকে ২ হাজার টাকা দিতে হবে বলে দাবি করেন। ওই সময় অতরিক্ত পিপি  মোজাহার  আলীর প্রতিনিধি মোজাহারের সঙ্গে কথা বলে একই  ফোনে অতিরিক্ত পিপি  পেশকারের সঙ্গে অনুরোধের সাথে কথা বলার পরও  পেশকার ২ হাজার টাকা ছাড়া কিছুই দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে  দেন। একটি পত্রিকার সম্পাদককে যখন এমন বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হচ্ছে তা হলে সাধারণ মানুষের কি হচ্ছে তা  কেবল মাত্র ভুক্তভোগিরাই হাড়ে হাড়ে  টের পাচ্ছে। পরবর্তীতে ডিস্ট্রিক এ্যান্ড সেসান জজ কোর্টের নকল শাখার প্রধান তুলনাকারী সাইদুর রহমানের আন্তরিক সহযোগিতায় সরকারি ফি দিয়ে ওই সকল কাগজপত্র তুলেছি।
বিটিবি নিউজের অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে,  ফাইলিং এর জন্য অধিকাংশ পেশকার ৫০-১০০ টাকা, বাদি বা স্বাক্ষীর স্বাক্ষর নিতেও পেশকার-পিয়নকে দিতে হয় ১০০-২০০টাকা কিংবা ব্যক্তি বুঝে তারও বেশি। ওয়ারেন্ট ও সমনের প্রসেস দিতে পেশকারকে দিতে হয় ১শত টাকা। পুটআপে পেশকারকে দিতে হয় ১শত টাকা, বেল বন্ডে পেশকারকে দিতে হয় ১৫০ থেকে ব্যক্তি বুঝে আরো বেশি। কোনো কারণে তারিখ যদি বিচারক না দেন পেশকার যদি দেন সে ক্ষেত্রে পেশকারের দাবিকৃত চাহিদা মতো ২শ থেকে ৫শত কিংবা তারও বেশি টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। জেলা খানায় আসামী থাকলে বেল বন্ড নিয়ে যেতে পিয়নকে ১০০ কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি টাকা দিতে হয়। 
অনেক সময় বাদি-বিবাদীর পক্ষে রায় কিংবা জামিন নিয়ে দেয়ার জন্য উভয় পক্ষের কাছ থেকে পেশকাররা বিচারকদের নাম ভাঙ্গিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ারও গুঞ্জন রয়েছে। কাজ না হলে টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রæতিও দেন তারা। যেহেতু তারা উভয় পক্ষের নিকট থেকেই গোপনে টাকা নেয় সেই ক্ষেত্রে এক পক্ষকে প্রয়োজনে টাকা ফেরত দিয়ে থাকেন। ওই সকল টাকা নেয়ার জন্য অধিকাংশ অসৎ পেশকারগণ আইনজীবি, আইনজীবি সহকারী ও মক্কেলদেরকে বাধ্য করে থাকেন বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে। বিচারকগনের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা টাকা নিলে বিচারকগন স্বপ্নেও সে বিষয়ে তাঁরা জানেন না বলেও আপাতত দৃষ্টে মনে হয়। অন্যদিকে জারিকারকরা কোন নোটিশ বাদি-বিবাদীর নিকট পৌঁছাতে নানা কায়দা-কৌশলে সর্বনিম্ন ৫’শ থেকে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকেন বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।  
অধিকাংশ অসৎ  পেশকার, পিয়ন, জারিকারকদের এমন ঘটনার অনেক উদাহরণ অনেকেরই জানা। তবে এসব বিষয়ে তদারকি করা হয় কিনা তা আমার জানা  নেই।  জেলার আদালতগুলোয় একেকটি মামলায়  কোনো  কোনো  ক্ষেত্রে অযথা লম্বা লম্বা তারিখ  ফেলে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি করা হয় কিনা, এ বিষয়ে হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট  থেকে ভালোভাবে  দেখভাল করা হয় কিনা  সে বিষয়টি  দেশের মানুষ সঠিকভাবে জানতে বা বুঝতে পারছেন না বলেও আমার মনে হয়। ফলে অনেক মামলার  ক্ষেত্রেই ইচ্ছাকৃত বা দুরভিসন্ধিমূলকভাবে লম্বা লম্বা তারিখ  ফেলানোর সন্দেহটিও একেবারে অমূলক নয়।
আগেই বলা হয়েছে, সামান্য মামলাতেও লম্বা লম্বা তারিখ  ফেলার ঘটনা আমাদের অনেকেরই জানা। এখন  সেসব ঘটনার প্রতিকার কী  সে বিষয়টি খুঁজে  বের করাই হবে সময়ের কাজ। যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং সর্বোচ্চ আদালত  থেকে যদি বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আদালতের ওই  শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী-উকিলের দায়িত্বহীনতা যদি থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে, এমনকি এক্ষেত্রে যদি  কোনো বিচারকের গাফিলতি থাকে  সে বিষয়টিও নজরদারি করে  দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা যায়, তাহলে  দেশের নিরীহ বিচারপ্রার্থীদের জন্য তা একটি সুখবর বলেই বিবেচিত হবে।
কারণ ছয় মাস বা এক বছরেই  যে বিচারকার্যটি নিষ্পত্তি হতে পারত, তারিখের পর তারিখ  ফেলে বছরের পর বছর ধরে তা  যে প্রলম্বিত করা হয়  সে বিষয়টিও কিন্তু ওপেন সিক্রেট!  দেশের প্রতিটি বিচারালয়ে  যে উপচে পড়া ভিড় এবং মাননীয় বিচারকরা  যে, এসব ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন  সে কথাটি  যেমন সত্য, ঠিক  তেমনি একশ্রেণির বিচারক সামান্য একটি মামলা যা অতি সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব,  সেক্ষেত্রেও নানা কারণে দীর্ঘসূত্রতার পথে হাঁটেন  এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
এ অবস্থায়  যেসব মামলা সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব, আদালতের  পেশকার-কর্মচারী বা একশ্রেণির উকিলের ইচ্ছার বলি হয়ে  সেসব মামলা  যেন দীর্ঘসূত্রতার পথে না হাঁটে  সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারকদেরই কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আর  সেসব বিষয়ে সজাগ  থেকে মামলাগুলোদ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিচারকদের  টেবিলে মামলার জটও অনেকাংশে কমে আসবে।
অন্যথায় আদালতের ওই  শ্রেণির  পেশকার-কর্মচারী ও উকিল তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যদি আদালতকে ব্যবহার করার সুযোগ পান, তাহলে যুগ যুগ ধরে বিচারপ্রার্থী মানুষের হয়রানি অব্যাহত থাকবে। সুতরাং আদালতকে সুষ্ঠু ও গতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনতে  দেশের ৬৪টি  জেলার বিচারককেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
আদালতের  কোনো  পেশাকার-কর্মচারী  কোনো বিচারপ্রার্থীর  নোটিস জারির  ক্ষেত্রে তা  ফেলে রাখা, সঠিকভাবে বিলি না করা ইত্যাদি কর্মকান্ডে  জড়িত কিনা, বা  কোনো  পেশকার-উকিলের  যোগসাজশে বিচারকার্যকে দীর্ঘসূত্রতায়  ফেলা হচ্ছে কিনা- এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট আদালতের মাননীয় বিচারকদেরই খুঁজে  দেখতে হবে।
একজন বিচারপ্রার্থীর সঠিক ও সুষ্ঠু বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন বিচারকেরই আরও  বেশি ভূমিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা  দেখা দিয়েছে। কারণ আদালতের প্রশাসনিক কর্মচারীদের মূল্যবোধের অভাবে বিচারপ্রার্থী জনগণকে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। আদালত  থেকে একটি রায় বা অন্য  কোনো কাগজপত্রের একটি কপি ওঠাতে  গেলেই ভুক্তভোগীরা তা হাড়ে হাড়ে  টের পান।
এ অবস্থায় বিচারালয়ে যদি কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রাধান্য বজায় থাকে, তাহলে যুগ যুগ ধরে বিচারপ্রার্থীদের যন্ত্রণা-বঞ্চনা অব্যাহত থাকবে। বিচার প্রার্থনা করতে গিয়ে তাদের দুই-তিনগুণ অর্থ ও সময়ের অপচয় করতে হবে।
ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমলের কথা শুনেছি, একজন উকিল বা  মোক্তার একটি  কেস গ্রহণ করার পর বছরের পর বছর পার হলে  সেই উকিল সাহেবের মৃত্যুর পরও তার পুত্র বা উত্তরসূরিকে  সেই মামলা বছরের পর বছর ধরে পরিচালনা করতে হতো।
কিন্তু আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর যদি  সেই অবস্থাই বহাল থাকে, তাহলে স্বাধীনতার সুফল জনগণ  ভোগ করছেন- এক্ষেত্রে  সে কথাটিই বা  ধোপে  টেকে কীভাবে? বলা বাহুল্য, এখনও একজন সাধারণ নাগরিককে সামান্য একটি মামলায় বছরের পর বছর আদালতে  ঘোরাঘুরি করতে হয়। আর এক্ষেত্রে আদালতের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বহুলাংশে দায়ী।
এ বিভাগেরও দু’চারজন  অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী/কৌসুলি-মুহুরীদের নানা অনিয়ম-হয়রানি নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের মাঝে হরেক রকমের প্রশ্ন উঁকি-ঝুঁকি মারছে। প্রার্থী/আসামী/ভুক্তভোগীরা ওই সকল অসৎ ব্যক্তিদের দ্বারা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ হয়রানির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে বলেও সংশ্লিষ্টদের ধারনা। ওই সকল অসৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী/কৌসুলি-মুহুরীদের জন্য স্ব-স্ব বিভাগের বদনাম অনেকের কানে ভেসে বেড়াচ্ছে। এখন-ই অসৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী/কৌসুলি-মুহুরীদের অনিয়ম, হয়রানির লাগাম টেনে ধরতে হবে। কর্তব্যে অবহেলা ওই সকল অন্যায় ও অনিয়মের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের সংশোধনে উদ্বুদ্ধকরণ এবং দৃশ্যমান শাস্তি প্রদানের মধ্যমে তাদেরকে ঢেলে সাজিয়ে উৎকৃষ্টমানের মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও টেকসই মানব সম্পদ গড়ে তুলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আনতে হবে বলেও সমাজ বিশ্লেষকদের ধারনা। তাছাড়া সমুদ্র তলদেশ থেকে আকাশ পথে বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাসানোর একমাত্র কান্ডারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে বলেও অনেকের ধারনা।
আর  সেই সঙ্গে বিষয়টির প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, অন্যান্য  ক্ষেত্রে অগ্রগতি তথা গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে  দেশের আইন-আদালতেও গতিশীলতা আনয়ন করা প্রয়োজন।  ভেবে  দেখা প্রয়োজন এখনও  কেন সামান্য  ছোটখাটো একটি মামলাতেও একজন বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর আদালতে  ঘোরাঘুরি, হয়রানি-পেরেশানিসহ দুই-তিনগুণ সময় ও অর্থ খরচ করতে হবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই,  দেশের মানুষের জন্য আইনি সুবিধা সহজতর করার লক্ষ্যে বিচারাঙ্গনে নজরদারি বাড়ানো দরকার বলেই মনে হয়।
বিচার বিভাগের কাজকে গতিশীল করাসহ সঠিক সময়ে জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে  দেশের আদালত অঙ্গনে বিরাজমান সমস্যাগুলো শনাক্ত করে তা দূর করার  কোনো বিকল্প  নেই। এ  ক্ষেত্রে সরকার তথা আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। এ কথা সবার মনে রাখতে হবে  যে আদালতই হচ্ছে জনগণের  শেষ আশ্রয়স্থল;  শেষ আশা-ভরসার জায়গা। তাই আদালত অঙ্গনে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান  রেখে সঠিক সময়ে, সঠিকভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক হাসান মাহমুদুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে ফোনটি রিসিভ না হওয়ায় তাঁর মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে তাঁর মতামত নিতে পারলে আগামী কোন এক পর্বে তা তুলে ধরা সম্ভব হবে ইনশাল্লাহ্। চলবে ..............